Thursday, January 15, 2026

মানব সমাজের বিবর্তন: শিকার ও সংগ্রহ থেকে আধুনিক নগর শিল্প সমাজে উত্তরণ

 


ভূমিকা

মানব সমাজের বিবর্তন একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া যা হাজার হাজার বছর ধরে বিস্তৃত এবং এর যাত্রাপথটি আর্থ-সামাজিক বৈশিষ্ট্য, জীবনযাত্রা এবং সংস্কৃতির গভীর রূপান্তরের দ্বারা চিহ্নিত। লুইস হেনরি মর্গান, কার্ল মার্ক্স এবং হার্বার্ট স্পেন্সারের মতো প্রাথমিক সমাজবিজ্ঞানী ও নৃতাত্ত্বিকরা সামাজিক বিবর্তনের এই ধারাকে শ্রেণীবদ্ধ করার জন্য বিভিন্ন তাত্ত্বিক কাঠামো প্রস্তাব করেছিলেন। যদিও তাদের মডেলগুলো ভিন্ন ছিল—যেমন মর্গানের প্রযুক্তিগত পর্যায়, মার্ক্সের অর্থনৈতিক শ্রেণি সংগ্রাম, বা স্পেন্সারের সামাজিক জটিলতার বৃদ্ধি—তারা সম্মিলিতভাবে সমাজকে একটি পরিবর্তনশীল সত্তা হিসেবে অধ্যয়নের ভিত্তি স্থাপন করেন। এই গবেষণাপত্রটি মানব সমাজের এই বিবর্তনমূলক যাত্রাকে চারটি প্রধান পর্যায়—শিকারী ও সংগ্রাহক সমাজ, পশুপালন ও কৃষিভিত্তিক সমাজের উদ্ভব, শিল্প সমাজের উত্থান এবং আধুনিক নগর সমাজের বিকাশ—এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করবে।

১.০ মানব সমাজের ঊষালগ্ন: শিকারী ও সংগ্রাহক সম্প্রদায়

শিকারী ও সংগ্রাহক সমাজ মানব সামাজিক সংগঠনের প্রাচীনতম রূপ, যা জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর প্রত্যক্ষ ও সম্পূর্ণ নির্ভরশীলতার দ্বারা সংজ্ঞায়িত। এই foundational পর্যায়টি বোঝা পরবর্তী সামাজিক রূপান্তরগুলোর বিশালতা অনুধাবন করার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি মানব সমাজের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল। এই সমাজগুলো সাধারণত ছোট, গতিশীল এবং সমতাবাদী ছিল, যেখানে মানুষ কয়েক ডজন থেকে কয়েকশ জনের ঘনিষ্ঠ দলে বাস করত।

শিকারী ও সংগ্রাহক সমাজের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • জীবনধারণ: এই সমাজগুলো তাদের জীবনধারণের প্রয়োজনে সম্পূর্ণরূপে প্রাকৃতিক সম্পদের উপর নির্ভর করত। তারা বন্য প্রাণী শিকার এবং খাদ্য হিসেবে বন্য উদ্ভিদ, ফল ও বাদাম সংগ্রহ করত, যা তাদের জীবনযাত্রাকে প্রকৃতির চক্রের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছিল।

  • গতিশীলতা: খাদ্য ও সম্পদের সন্ধানে বা পরিবর্তিত পরিবেশগত পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়ায় এই সমাজগুলো যাযাবর জীবনযাপন করত। এই অবিরাম গতিশীলতা স্থায়ী জনবসতি এবং সম্পদ সঞ্চয়ের পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল।

  • সমতা: শিকারী ও সংগ্রাহক সমাজগুলো সাধারণত সমতাবাদী ছিল, যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক স্তরবিন্যাস বা সামাজিক শ্রেণি ছিল না। এর প্রধান কারণ ছিল তাদের যাযাবর জীবনযাত্রা এবং উদ্বৃত্ত সম্পদ তৈরির সুযোগের অভাব, যা ক্ষমতা ও সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে বাধা দিত। সিদ্ধান্তগুলো কোনো একক নেতার কর্তৃত্বের পরিবর্তে ঐকমত্যের মাধ্যমে নেওয়া হতো।

  • আত্মীয়তা: সামাজিক সম্পর্কগুলো মূলত আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে সংগঠিত হতো। পারিবারিক গোষ্ঠীগুলোই ছিল সমাজের মৌলিক একক এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মূল ভিত্তি।

  • লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকা: এই সমাজগুলোতে প্রায়শই লিঙ্গ-নির্দিষ্ট ভূমিকা এবং দায়িত্ব থাকত। পুরুষরা সাধারণত শিকারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করত, আর নারীরা উদ্ভিদ-ভিত্তিক খাদ্য সংগ্রহ এবং সন্তানদের যত্ন নেওয়ার মতো স্থিতিশীল কাজে নিযুক্ত থাকত, যা গোষ্ঠীর টিকে থাকাকে নিশ্চিত করত।

  • প্রযুক্তি: শিকার ও সংগ্রহের জন্য তারা বিভিন্ন সরল কিন্তু কার্যকর সরঞ্জাম ও কৌশল তৈরি করেছিল, যার মধ্যে ছিল বর্শা, তীর-ধনুক, খনন করার লাঠি এবং ফাঁদ। এই প্রযুক্তিগুলো তাদের পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করেছিল।

সারণী ১: ঐতিহাসিক শিকারী-সংগ্রাহক সমাজের ভৌগলিক উদাহরণ

অঞ্চল

উল্লেখযোগ্য উদাহরণ

আফ্রিকা

দক্ষিণ আফ্রিকার সান জনগোষ্ঠী এবং তানজানিয়ার হাদজা জনগোষ্ঠী।

এশিয়া

উত্তর রাশিয়ার নেনতেস এবং মালয়েশিয়ার সেমাং জনগোষ্ঠী।

অস্ট্রেলিয়া ও ওশেনিয়া

আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ান এবং পাপুয়া নিউ গিনির অনেক আদিবাসী সম্প্রদায়।

উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা

কানাডা ও আলাস্কার ইনুইট, ব্রাজিল ও ভেনিজুয়েলার ইয়ানোমামি এবং আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের হোপি জনগোষ্ঠী।

মানব ইতিহাসের প্রথম বড় সন্ধিক্ষণ ছিল চারণ বা খোঁজাখুঁজি থেকে উদ্ভিদ ও প্রাণীর গৃহপালনের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদনে স্থানান্তর, যা কেবল জীবনধারণের পদ্ধতিই পরিবর্তন করেনি, বরং মানব সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

২.০ প্রথম মহৎ রূপান্তর: পশুপালন ও আদিম কৃষি

প্রায় ১০,০০০ বছর আগে শুরু হওয়া কৃষি ও পশু গৃহপালনের বিকাশ একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছিল। এই রূপান্তর প্রথমবারের মতো খাদ্য উদ্বৃত্তের সুযোগ করে দেয়, যা স্থায়ী জনবসতি স্থাপন এবং আরও জটিল সামাজিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন করে মানব সমাজকে এক নতুন পথে চালিত করে।

২.১ যাযাবর পশুপালক সমাজ

যাযাবর পশুপালক সমাজগুলো কৃষির বিকাশের পর সেইসব অঞ্চলে আবির্ভূত হয় যেখানে পরিবেশগত সীমাবদ্ধতার কারণে কৃষিকাজ করা কঠিন ছিল। এই সমাজগুলো পশু পালনের উপর নির্ভর করে এক বিকল্প জীবনযাত্রার সূচনা করে। মধ্য এশিয়া, পূর্ব আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের মতো অনেক অঞ্চলের ইতিহাসে ও সংস্কৃতিতে যাযাবর পশুপালকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

এর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • গতিশীলতা: পশুপালকরা তাদের পশুপালের জন্য নতুন চারণভূমির সন্ধানে ঋতুভিত্তিক স্থানান্তরে অভ্যস্ত ছিল, যা তাদের জীবনযাত্রার মূল চালিকাশক্তি ছিল।

  • পশুর উপর নির্ভরশীলতা: পশুপালনই ছিল তাদের জীবিকা নির্বাহের প্রাথমিক উৎস এবং তাদের পশুদের সাথে গভীর সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সংযোগ বিদ্যমান ছিল।

  • সামাজিক সংগঠন: আত্মীয়তার সম্পর্ক এবং গোষ্ঠী বা উপজাতীয় পরিচয়ের উপর ভিত্তি করে তাদের জটিল সামাজিক সংগঠন গড়ে উঠেছিল।

  • অভিযোজনযোগ্যতা: পরিবেশের অপ্রত্যাশিত প্রকৃতির কারণে পশুপালকরা অত্যন্ত অভিযোজনযোগ্য ছিল এবং সম্পদের প্রাপ্যতার পরিবর্তনে দ্রুত সাড়া দিতে পারত।

  • বাণিজ্য: পশুপালকরা প্রায়শই স্থায়ী কৃষি সম্প্রদায়ের সাথে বাণিজ্য করত এবং তাদের পশু পণ্য (যেমন: মাংস, দুধ, চামড়া) বিনিময় করে শস্য বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করত।

  • মৌখিক ঐতিহ্য: সাংস্কৃতিক জ্ঞান, ইতিহাস এবং গল্পগুলো বংশ পরম্পরায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য তারা সমৃদ্ধ মৌখিক ঐতিহ্যের উপর নির্ভর করত।

  • শিল্পকলার প্রকাশ: অনেক পশুপালক সমাজে সংগীত, নৃত্য, বস্ত্রবয়ন এবং অলংকার তৈরির মতো সমৃদ্ধ শৈল্পিক ঐতিহ্য বিদ্যমান ছিল, যা তাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরত।

২.২ কৃষি বিপ্লব এবং আদিম কৃষি সমাজ

নব্য প্রস্তর যুগীয় বিপ্লব জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষির সূচনা করে, যা মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ঘটনা। প্রায় ১০,০০০ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের উর্বর অর্ধচন্দ্রাকৃতি অঞ্চলে গম এবং বার্লি চাষের মাধ্যমে এর প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হয়। আদিম এবং জীবিকা নির্বাহভিত্তিক কৃষি সমাজগুলো ছোট আকারের চাষাবাদ, সরল সরঞ্জাম, বিভিন্ন ফসলের চাষ এবং সীমিত প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। কিছু সমাজ যাযাবর পশুপালনের পাশাপাশি আংশিক কৃষিকাজ করত, আবার অনেকে স্থায়ীভাবে একই জমিতে চাষাবাদ করে বসতি স্থাপন করেছিল। এই সমাজগুলো ভূমি ও প্রাকৃতিক জগতের সাথে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিল এবং একটি টেকসই জীবনযাত্রা বজায় রাখতে সক্ষম ছিল।

সারণী ২: আদিম কৃষি সমাজের সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাঠামো

বৈশিষ্ট্য

সামাজিক প্রভাব

সমতাবাদী সামাজিক কাঠামো

আনুষ্ঠানিক স্তরবিন্যাস প্রায় অনুপস্থিত ছিল এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ সাধারণত ঐকমত্যের ভিত্তিতে হতো। সম্পদ সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতা ছিল।

দৃঢ় সাম্প্রদায়িক বন্ধন

সম্প্রদায়কে অত্যন্ত মূল্য দেওয়া হতো এবং মানুষ একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত থাকত। ভাগাভাগি করা ঐতিহ্য ও আচারের মাধ্যমে এই বন্ধন শক্তিশালী হতো।

প্রকৃতির সাথে সংযোগ এবং আধ্যাত্মিক বিশ্বাস

জীবিকা নির্বাহের জন্য ভূমির উপর প্রত্যক্ষ নির্ভরশীলতার কারণে প্রকৃতির সাথে একটি শক্তিশালী আধ্যাত্মিক সংযোগ ছিল। আধ্যাত্মিক বিশ্বাসগুলো প্রায়শই ফসল বোনা ও কাটার চক্রের সাথে যুক্ত ছিল।

সীমিত বাণিজ্য এবং বাজার বিনিময়

এই সমাজগুলো তুলনামূলকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, যেখানে বাণিজ্য বা বাজার বিনিময় সীমিত আকারে সংঘটিত হতো। কৃষকরা মূলত নিজেদের এবং সম্প্রদায়ের ভোগের জন্য ফসল ফলাত।

কৃষি থেকে প্রাপ্ত উদ্বৃত্ত খাদ্য জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা আনলেও, এটি পরবর্তী মহাবিপর্যয়ের বীজও বপন করেছিল। এর ফলে সৃষ্ট দক্ষতা অবশেষে প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করে, যা ভূমির পরিবর্তে যান্ত্রিক উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে একটি নতুন সামাজিক মডেলের পথ প্রশস্ত করে।

৩.০ যন্ত্রের যুগ: শিল্প সমাজের উত্থান

শিল্প বিপ্লব ছিল সামাজিক বিবর্তনের পরবর্তী মহালম্ফ। অষ্টাদশ শতাব্দীতে শুরু হওয়া এই সময়কালটি উৎপাদন, শ্রম এবং মানব বসতির ধরণকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে দেয়। এর তাৎপর্য হলো এটি মানব সমাজকে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে যন্ত্রচালিত উৎপাদনে রূপান্তরিত করে, যা দ্রুত নগরায়নের দিকে পরিচালিত করে এবং আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি স্থাপন করে।

৩.১ শিল্প বিকাশের পর্যায়ক্রম

শিল্প সমাজের বিকাশ বিভিন্ন পর্যায়ে ঘটেছে, যা নিচে বর্ণনা করা হলো:

১. প্রথম শিল্প বিপ্লব: অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটেনে এর সূচনা হয়। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের মতো নতুন যন্ত্র ও প্রযুক্তির আবিষ্কার কারখানাগুলোতে ব্যাপক হারে পণ্য উৎপাদন সম্ভব করে তোলে, যা উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে অভূতপূর্বভাবে বৃদ্ধি করে।

২. দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব: এটি ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে শুরু হয় এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। বিদ্যুৎ এবং অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের মতো নতুন প্রযুক্তির আবিষ্কার অটোমোবাইল ও রাসায়নিক শিল্পের মতো নতুন শিল্পের জন্ম দেয়। এই সময়ে ব্যাপক উৎপাদন এবং ভোক্তা সংস্কৃতির উত্থান ঘটে।

৩. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়কাল: এই সময়টি কল্যাণ রাষ্ট্রের বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে সরকারি হস্তক্ষেপের প্রসারের দ্বারা চিহ্নিত। এছাড়াও বহুজাতিক কর্পোরেশন এবং তথ্য ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিষেবা খাতের ব্যাপক বৃদ্ধি ঘটে।

৪. বিশ্বায়ন ও তথ্য যুগ: শিল্প সমাজের বর্তমান পর্যায়টি বিশ্বায়ন এবং তথ্য যুগ দ্বারা চিহ্নিত। ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির উত্থান মানুষের যোগাযোগ, কাজ এবং পণ্য ও পরিষেবা ভোগের পদ্ধতিকে রূপান্তরিত করেছে, যা একটি বিশ্বব্যাপী আন্তঃসংযুক্ত অর্থনীতি তৈরি করেছে।

৩.২ শিল্প সমাজের নির্ধারক বৈশিষ্ট্য

শিল্প সমাজের মূল ভিত্তিগুলো একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, যা সম্মিলিতভাবে এক নতুন সামাজিক কাঠামো তৈরি করেছে।

  • প্রযুক্তিগত অগ্রগতি: শিল্প সমাজ উন্নত প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের দ্বারা চিহ্নিত। যন্ত্রপাতি, কম্পিউটার এবং টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার মতো উদ্ভাবনগুলো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দক্ষতা ও গতি বাড়িয়েছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিশ্ব বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছে।

  • শ্রম বিভাজন: প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত করা সম্ভব হয়, যা শ্রম বিভাজনের জন্ম দেয়। ব্যক্তিরা নির্দিষ্ট কাজে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠায় উৎপাদনশীলতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, যদিও এটি শ্রমিকের কাজকে একঘেয়ে করে তুলতে পারে।

  • নগরায়ন: কারখানাকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, যা গ্রামীামীণ এলাকা থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষকে শহরের দিকে আকৃষ্ট করে। এই শ্রম বিভাজন এবং কর্মসংস্থানের সন্ধান অনিবার্যভাবে নগরায়নকে ত্বরান্বিত করে, যার ফলে নতুন শহুরে কেন্দ্র এবং অবকাঠামো তৈরি হয়।

  • ব্যাপক উৎপাদন এবং ভোগবাদ: যন্ত্রপাতি এবং অ্যাসেম্বলি লাইনের ব্যবহার প্রমিত পণ্যের ব্যাপক উৎপাদন সম্ভব করে তোলে। এর ফলে পণ্যের দাম কমে যায় এবং একটি বৃহৎ ভোক্তা বাজারের সৃষ্টি হয়, যা ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং বিপণন শিল্পের বিকাশ ঘটায়।

  • আমলাতন্ত্র: ব্যাপক উৎপাদন ও বিশাল জনসংখ্যা পরিচালনার জন্য কর্পোরেশন, সরকারি সংস্থা এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মতো জটিল ও স্তরবিন্যাসযুক্ত আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প প্রক্রিয়াগুলো সংগঠিত ও পরিচালনা করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

শিল্প সমাজের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে আলোচনাটি সেই নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে স্থানান্তরিত হয় যেখানে এই পরিবর্তনগুলো চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল: আধুনিক শহর।

৪.০ জটিলতার শিখর: আধুনিক নগর সমাজ

শহরগুলো হাজার হাজার বছরের সামাজিক বিবর্তনের চূড়ান্ত পরিণতি এবং মানব বসতির সবচেয়ে জটিল রূপ। শহরগুলো কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র নয়, বরং সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। এই বিভাগে শহরের বিকাশের ঐতিহাসিক পর্যায় এবং সমসাময়িক নগর জীবনের নির্ধারক বৈশিষ্ট্যগুলো অন্বেষণ করা হবে।

৪.১ শহরের বিবর্তন

  • ১. প্রাক-শিল্প শহর:

    • বর্ণনা: প্রাচীনকালে শুরু হয়ে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত এই শহরগুলো ছিল বাণিজ্য, প্রশাসন ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের ছোট কেন্দ্র। এদের ভৌত বিন্যাস ছিল সংকীর্ণ ও অপরিকল্পিত এবং সামাজিক স্তরবিন্যাস ছিল অত্যন্ত প্রকট, যেখানে অভিজাতরা কেন্দ্রে এবং সাধারণ মানুষ উপকণ্ঠে বাস করত।

    • উদাহরণ: রোম, বেইজিং।

  • ২. শিল্প শহর:

    • বর্ণনা: শিল্প বিপ্লবের ফলে এই শহরগুলোর উদ্ভব হয়। কারখানা, ব্যাপক হারে গ্রামীণ-শহুরে অভিবাসন এবং গ্রিডের মতো পরিকল্পিত রাস্তার বিন্যাস ছিল এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই শহরগুলো দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সম্মুখীন হয়েছিল।

    • উদাহরণ: ম্যানচেস্টার, পিটসবার্গ।

  • ৩. শিল্প-পরবর্তী শহর:

    • বর্ণনা: বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে উৎপাদন খাত থেকে সরে এসে অর্থ, প্রযুক্তি এবং শিল্পের মতো পরিষেবা-ভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ঝোঁকার ফলে এই শহরগুলোর উদ্ভব হয়। এগুলো প্রায়শই জ্ঞান ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

    • উদাহরণ: বার্লিন, সিয়াটেল।

  • ৪. বৈশ্বিক শহর:

    • বর্ণনা: বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আবির্ভূত এই শহরগুলো বিশ্ব অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্কের প্রধান কেন্দ্র। এগুলো অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়, উন্নত প্রযুক্তির কেন্দ্র এবং এখানে সুযোগের প্রাচুর্যের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সম্পদ বৈষম্যও বিদ্যমান।

    • উদাহরণ: নিউ ইয়র্ক সিটি, টোকিও।

৪.২ সমসাময়িক নগর ক্ষেত্রের বৈশিষ্ট্য

আধুনিক নগর সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলো সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই উপস্থাপন করে, যা তাদের জটিলতাকে তুলে ধরে।

সারণী ৩: আধুনিক নগর সমাজের বৈশিষ্ট্য—সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

বৈশিষ্ট্য

উদাহরণ সহ সুযোগ

উদাহরণ সহ চ্যালেঞ্জ

বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যা

নিউ ইয়র্ক সিটি: বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষের উপস্থিতি একটি সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করে।

নিউ ইয়র্ক সিটি: সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য এবং আয় বৈষম্যের মতো চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।

ঘন এবং কেন্দ্রীভূত বসতি

টোকিও: বিস্তৃত পাতাল রেল ও দ্রুতগতির রেল ব্যবস্থার মতো উদ্ভাবনী পরিবহন সমাধান তৈরি হয়।

টোকিও: আবাসন, পরিবহন এবং সরকারি পরিষেবার মতো সম্পদের উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে।

উন্নত প্রযুক্তি

সিঙ্গাপুর: উন্নত অবকাঠামো পণ্য ও মানুষের দক্ষ চলাচল এবং তথ্য ও পরিষেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে।

উন্নত প্রযুক্তি ডিজিটাল বিভাজন তৈরি করতে পারে এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

অর্থনৈতিক সুযোগ

মুম্বাই: কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা এবং বিনিয়োগের বিস্তৃত সুযোগ প্রদান করে, যা অনেকের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে।

মুম্বাই: তীব্র অসমতা এবং দারিদ্র্য তৈরি করতে পারে, যেখানে অনেকে মৌলিক পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হয়।

সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন

প্যারিস: জাদুঘর, থিয়েটার এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে প্রবেশাধিকার সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে।

সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোতে জীবনযাত্রার ব্যয় অত্যধিক হতে পারে, যা অনেককে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত করে।

পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ

বেইজিং: পরিবেশগত সমস্যা মোকাবেলায় নীতি গ্রহণ এবং নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়।

বেইজিং: বায়ু দূষণ, জল দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ নগরবাসীর স্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলে।

রাজনৈতিক ক্ষমতা

লন্ডন: জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নীতি নির্ধারণ এবং সাংস্কৃতিক প্রবণতার উপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।

লন্ডন: আবাসন সংকট, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো সমস্যার সম্মুখীন, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।

আধুনিক নগর সমাজে উত্তরণের এই যাত্রাটি অসাধারণ অগ্রগতি প্রদর্শন করলেও এটি একটি নতুন এবং জটিল চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে যা ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

৫.০ উপসংহার

মানব সমাজের বিবর্তন একটি অসাধারণ যাত্রা, যা ছোট, যাযাবর শিকারী-সংগ্রাহক দল থেকে আজকের বিস্তৃত, আন্তঃসংযুক্ত বৈশ্বিক শহরে রূপান্তরিত হয়েছে। এই গবেষণাপত্রে আলোচিত মূল রূপান্তরমূলক মাইলফলকগুলো—যেমন কৃষির বিকাশ, শিল্প বিপ্লব এবং নগরায়নের উত্থান—মানব জীবনকে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে এবং সামাজিক কাঠামোকে ক্রমাগত জটিলতর করেছে। যদিও আধুনিক সমাজগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেক প্রাচীন চ্যালেঞ্জ, যেমন খাদ্যের অভাব বা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, কাটিয়ে উঠেছে, তারা এখন জলবায়ু পরিবর্তন, গভীর অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো নতুন ও গুরুতর বাধার সম্মুখীন। এই নতুন চ্যালেঞ্জগুলোই মানব সমাজের বিবর্তনের পরবর্তী পর্যায়কে সংজ্ঞায়িত করবে এবং আমাদের সম্মিলিত ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

________________________________________

মানব সমাজের বিবর্তন: একটি বিশদ অধ্যয়ন নির্দেশিকা

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নাবলী (কুইজ)

নির্দেশনা: নিম্নলিখিত প্রশ্নগুলির উত্তর দুই থেকে তিন বাক্যে দিন। প্রতিটি উত্তর প্রদত্ত তথ্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি করতে হবে।

১. শিকার ও খাদ্য সংগ্রহকারী সমাজকে কেন যাযাবর বলা হতো? ২. কৃষি উদ্ভাবন মানব ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয় কেন? ৩. শিকারী-সংগ্রহকারী সমাজের সামাজিক সংগঠন কীরূপ ছিল? ৪. মর্গান মানব সমাজের বিবর্তনকে কোন তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত করেছিলেন? ৫. পশুপালনকারী যাযাবর সমাজগুলি সাধারণত কোন ধরণের অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল এবং কেন? ৬. আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজের ব্যবহৃত সরঞ্জামগুলো কেমন ছিল? ৭. জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষি (Subsistence agriculture) বলতে কী বোঝায়? ৮. নব্যপ্রস্তরযুগীয় বিপ্লব (Neolithic Revolution) কী এবং এটি কখন শুরু হয়েছিল? ৯. শিল্প সমাজের বিকাশের প্রথম শিল্প বিপ্লবের সময়কাল এবং প্রধান উদ্ভাবন কী ছিল? ১০. শিল্প সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে নগরায়ণ (Urbanization) কীভাবে ঘটেছিল? ১১. আমলাতন্ত্র (Bureaucratization) শিল্প সমাজে কীভাবে বিকশিত হয়েছিল? ১২. আধুনিক শহুরে সমাজের প্রাক-শিল্প পর্যায় (Pre-Industrial Cities) বলতে কী বোঝানো হয়েছে? ১৩. শিল্পভিত্তিক শহর (Industrial Cities) এবং শিল্প-পরবর্তী শহর (Post-Industrial Cities)-এর মধ্যে মূল পার্থক্য কী? ১৪. বিশ্বায়ন এবং তথ্য যুগ (Globalization and Information Age) কীভাবে শিল্প সমাজের বর্তমান পর্যায়কে সংজ্ঞায়িত করে? ১৫. আধুনিক শহুরে সমাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে জনসংখ্যার বৈচিত্র্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে? ১৬. কার্ল মার্ক্স সমাজের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিতে মানব বিবর্তনকে কীভাবে ভাগ করেছেন? ১৭. পশুপালক যাযাবর সমাজের দুটি শৈল্পিক ঐতিহ্যের উদাহরণ দিন। ১৮. জীবিকা নির্বাহভিত্তিক কৃষি সমাজে সামাজিক কাঠামো সাধারণত কেমন ছিল? ১৯. বিশ্ব নগরী (Global Cities) বলতে কী বোঝায়? টোকিওকে কেন একটি বিশ্ব নগরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়? ২০. শিল্প সমাজের উদ্ভবের ফলে সৃষ্ট দুটি সামাজিক সমস্যার নাম লিখুন।

উত্তরমালা

১. শিকার ও খাদ্য সংগ্রহকারী সমাজগুলি যাযাবর ছিল কারণ তারা খাদ্য ও জলের সন্ধানে প্রতিনিয়ত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ঘুরে বেড়াতো। তাদের জীবনযাত্রা প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতার উপর নির্ভরশীল ছিল, যা তাদের গতিশীল জীবনযাপনে বাধ্য করত।

২. প্রায় ১০,০০০ বছর আগে কৃষির উদ্ভাবন মানব ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল কারণ এটি মানুষকে উদ্বৃত্ত খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম করে তোলে। এর ফলে কারিগর এবং ব্যবসায়ীর মতো বিশেষায়িত পেশার উদ্ভব হয় এবং মেসোপটেমিয়া, মিশর ও চীনের মতো প্রাথমিক সভ্যতা গড়ে ওঠে।

৩. শিকারী-সংগ্রহকারী সমাজের সামাজিক সংগঠন মূলত আত্মীয়তার সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠত। এই সমাজগুলো সাধারণত সমতাবাদী ছিল, যেখানে কোনও আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিন্যাস বা সামাজিক শ্রেণি ছিল না এবং সিদ্ধান্তগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে নেওয়া হতো।

৪. নৃতত্ত্ববিদ মর্গান মানব সমাজের বিবর্তনকে তিনটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত করেছিলেন: বন্য দশা (wild phase), বর্বর দশা (Barbarian phase), এবং সভ্য দশা (civilized phase)।

৫. পশুপালনকারী যাযাবর সমাজগুলো সাধারণত শুষ্ক বা আধা-শুষ্ক অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল যেখানে কৃষি কাজ করা কঠিন ছিল। এই অঞ্চলগুলোতে পশুদের জন্য চারণভূমির সন্ধানে তাদের ক্রমাগত স্থান পরিবর্তন করতে হতো, যা তাদের যাযাবর জীবনধারার মূল কারণ ছিল।

৬. আদিম কৃষিভিত্তিক সমাজের সরঞ্জামগুলো সাধারণত কাঠ, পাথর এবং হাড়ের মতো প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি এবং খুবই সাধারণ মানের ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কোদাল, লাঙ্গল, কাস্তে এবং শস্য পেষার জন্য হামানদিস্তা।

৭. জীবিকা নির্বাহের জন্য কৃষি বা জীবনধারণভিত্তিক কৃষি বলতে নিজের এবং নিজের সম্প্রদায়ের ভরণপোষণের উদ্দেশ্যে ফসল ফলানো এবং পশু পালন করার অনুশীলনকে বোঝায়। এই ধরনের সমাজে, কৃষিই জীবনধারণের প্রাথমিক উপায় এবং উৎপাদিত ফসলের বেশিরভাগই নিজেদের ভোগের জন্য ব্যবহৃত হয়।

৮. নব্যপ্রস্তরযুগীয় বিপ্লব হলো শিকারী-সংগ্রহকারী জীবনধারা থেকে স্থায়ী কৃষিভিত্তিক জীবনধারায় রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এটি প্রায় ১০,০০০ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের উর্বর অর্ধচন্দ্রাকৃতি অঞ্চলে (Fertile Crescent) গম এবং যবের মতো ফসল চাষের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।

৯. প্রথম শিল্প বিপ্লব ১৮ শতকের শেষের দিকে ব্রিটেনে শুরু হয়েছিল এবং এর প্রধান উদ্ভাবন ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন। এই প্রযুক্তি কারখানায় পণ্যের ব্যাপক উৎপাদনের সূচনা করে, যা উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

১০. শিল্প সমাজের বিকাশের সাথে সাথে নগরায়ণ ঘটেছিল কারণ মানুষ কারখানা এবং অন্যান্য শিল্পে কাজের সন্ধানে গ্রামীণ এলাকা থেকে শহরে চলে আসতে শুরু করে। এই অভিবাসনের ফলে শহরের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং নতুন শহুরে অবকাঠামো গড়ে ওঠে।

১১. শিল্প সমাজে আমলাতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল কারণ কর্পোরেশন, সরকারি সংস্থা এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের মতো বড় আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর উত্থান হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প প্রক্রিয়া এবং কার্যক্রমের সংগঠন ও ব্যবস্থাপনার জন্য স্তরবিন্যাসযুক্ত, কেন্দ্রীভূত এবং বিশেষায়িত কাঠামো তৈরি করে।

১২. আধুনিক শহুরে সমাজের প্রাক-শিল্প পর্যায় বলতে প্রাচীন কাল থেকে ১৮ শতকের শিল্প বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত সময়কে বোঝানো হয়। এই সময়ের শহরগুলো ছিল ছোট এবং এগুলোর অর্থনীতি মূলত কৃষি, কারুশিল্প এবং ক্ষুদ্র পরিসরের উৎপাদনের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।

১৩. শিল্পভিত্তিক শহরগুলো কারখানা এবং ব্যাপক উৎপাদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল, যার ফলে গ্রামীণ এলাকা থেকে ব্যাপক অভিবাসন ঘটে। অন্যদিকে, শিল্প-পরবর্তী শহরগুলোতে উৎপাদনভিত্তিক অর্থনীতি থেকে সরে এসে অর্থ, প্রযুক্তি এবং শিল্পের মতো পরিষেবা-ভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ঝোঁক দেখা যায়।

১৪. শিল্প সমাজের বর্তমান পর্যায়টি বিশ্বায়ন এবং তথ্য যুগ দ্বারা সংজ্ঞায়িত, যার বৈশিষ্ট্য হলো ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির উত্থান। এটি যোগাযোগ, কাজ এবং পণ্য ভোগের পদ্ধতিকে রূপান্তরিত করেছে এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খল (global supply chains) ও জাতীয় অর্থনীতির পারস্পরিক নির্ভরতা বৃদ্ধি করেছে।

১৫. আধুনিক শহুরে সমাজের জনসংখ্যার বৈচিত্র্য বলতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, জাতিগত এবং ধর্মীয় পটভূমির মানুষের সহাবস্থানকে বোঝানো হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নিউ ইয়র্ক সিটিতে ১৯০টিরও বেশি দেশের বাসিন্দা রয়েছে, যা শহরটিকে একটি সমৃদ্ধ ও প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে।

১৬. কার্ল মার্ক্স অর্থনৈতিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে মানব সমাজের বিবর্তনকে বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করেছেন। তার মতে, প্রতিটি পর্যায়ে ধনী ও দরিদ্র—এই দুটি অর্থনৈতিক শ্রেণি বিদ্যমান থাকে এবং তিনি বিবর্তনকে আদিম সাম্যবাদ, দাস সমাজ, সামন্তবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র এবং অবশেষে বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রহীন সাম্যবাদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

১৭. পশুপালক যাযাবর সমাজের দুটি শৈল্পিক ঐতিহ্য হলো সঙ্গীত ও নৃত্য এবং বস্ত্রশিল্প ও আলংকারিক শিল্প। এই সমাজগুলো তাদের मौखिक ঐতিহ্য এবং শৈল্পিক অভিব্যক্তির জন্য পরিচিত ছিল।

১৮. জীবিকা নির্বাহভিত্তিক কৃষি সমাজে সামাজিক কাঠামো সাধারণত সমতাবাদী ছিল, যেখানে খুব কম বা কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিন্যাস থাকত না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রায়শই ঐকমত্য বা সম্প্রদায়ের মতামতের ভিত্তিতে হতো, ব্যক্তিগত কর্তৃত্বের উপর ভিত্তি করে নয়।

১৯. বিশ্ব নগরী বা গ্লোবাল সিটি হলো এমন শহর যা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং সারা বিশ্ব থেকে প্রতিভা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম। টোকিওকে একটি বিশ্ব নগরী বলা হয় কারণ এটি তার উন্নত প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সনি ও টয়োটার মতো বড় কোম্পানিগুলোর কেন্দ্রস্থল হিসেবে উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতার জন্য পরিচিত।

২০. শিল্প সমাজের উদ্ভবের ফলে সৃষ্ট দুটি প্রধান সামাজিক সমস্যা হলো দারিদ্র্য এবং দূষণ। দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরগুলিতে কাজের সন্ধানে আসা মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে, যা প্রায়শই অপর্যাপ্ত আবাসন এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্ম দেয়।

প্রবন্ধমূলক প্রশ্ন

১. শিকার ও খাদ্য সংগ্রহকারী সমাজ থেকে কৃষিভিত্তিক সমাজে উত্তরণের প্রক্রিয়াটি মানব সমাজের জীবনযাত্রা, সামাজিক কাঠামো এবং প্রযুক্তির উপর কী ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল তা আলোচনা করুন। ২. কার্ল মার্ক্স এবং হার্ভার্ড স্পেন্সারের মানব সমাজের বিবর্তন সম্পর্কিত তত্ত্বগুলোর মধ্যে তুলনা ও বৈসাদৃশ্য তুলে ধরুন। তাদের তত্ত্বগুলো কীভাবে সমাজের অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ব্যাখ্যা দেয়? ৩. শিল্প বিপ্লব কীভাবে শিল্প সমাজ এবং পরবর্তীতে আধুনিক শহুরে সমাজের ভিত্তি স্থাপন করেছিল? প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, শ্রম বিভাজন এবং নগরায়ণের মধ্যে সম্পর্ক বিশ্লেষণ করুন। ৪. "আধুনিক শহুরে সমাজগুলি সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়েরই কেন্দ্রবিন্দু।"—এই উক্তিটির যথার্থতা অর্থনৈতিক সুযোগ, সাংস্কৃতিক জীবন এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের উদাহরণসহ ব্যাখ্যা করুন। ৫. জীবিকা নির্বাহভিত্তিক কৃষি সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলো আলোচনা করুন এবং দেখান যে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের সমাজ কীভাবে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

--------------------------------------------------------------------------------

পরিভাষাকোষ (Glossary)

পরিভাষা

সংজ্ঞা

আমলাতন্ত্র (Bureaucratization)

শিল্প সমাজে কর্পোরেশন, সরকারি সংস্থার মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ, যা প্রায়শই স্তরবিন্যাসযুক্ত, কেন্দ্রীভূত এবং বিশেষায়িত হয়ে থাকে।

আত্মীয়তা (Kinship)

পারিবারিক সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে সামাজিক সংগঠন, যা শিকারী-সংগ্রহকারী সমাজের মূল ভিত্তি ছিল।

উৎপাদন বিভাজন (Division of Labor)

শিল্প সমাজে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিদের বিশেষায়িত কাজ সম্পাদনের ব্যবস্থা, যা যন্ত্রপাতির ব্যবহারের মাধ্যমে সম্ভব হয় এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে।

উপভোক্তাবাদ (Consumerism)

শিল্প সমাজে নতুন পণ্য ও পরিষেবার ক্রমাগত প্রচার এবং ভোগের সংস্কৃতি, যা প্রায়শই সামাজিক মর্যাদা এবং জীবনযাত্রার সাথে যুক্ত।

নগরায়ণ (Urbanization)

শিল্প বিপ্লবের সময়কালে কাজের সন্ধানে মানুষের গ্রাম থেকে শহরে ব্যাপক অভিবাসনের প্রক্রিয়া, যার ফলে শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।

নব্যপ্রস্তরযুগীয় বিপ্লব (Neolithic Revolution)

প্রায় ১০,০০০ বছর আগে শুরু হওয়া একটি সময়কাল, যখন মানব সমাজ শিকারী-সংগ্রহকারী জীবনধারা থেকে স্থায়ী কৃষিভিত্তিক জীবনধারায় স্থানান্তরিত হয়।

প্রথম শিল্প বিপ্লব (The first Industrial Revolution)

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটেনে শুরু হওয়া একটি সময়, যা বাষ্পীয় ইঞ্জিনের মতো নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবনের মাধ্যমে কারখানায় ব্যাপক উৎপাদন শুরু করে।

বিশ্ব নগরী (Global Cities)

বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আবির্ভূত শহর, যা বিশ্ব অর্থনীতি ও সংস্কৃতির নেটওয়ার্কে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিভা ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করে।

বিশ্বায়ন (Globalization)

শিল্প সমাজের বর্তমান পর্যায়, যেখানে ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে পরস্পর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

যাযাবরবৃত্তি (Nomadism)

খাদ্য, জল বা চারণভূমির সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ক্রমাগত পরিভ্রমণ করার জীবনধারা, যা শিকারী-সংগ্রহকারী এবং পশুপালক সমাজের বৈশিষ্ট্য।

শিল্প সমাজ (Industrial Societies)

একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা পণ্য ও পরিষেবা উৎপাদনের জন্য উন্নত প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি এবং কারখানার ব্যাপক ব্যবহারের উপর ভিত্তি করে গঠিত।

সামন্তবাদ (Feudalism)

মধ্যযুগে ইউরোপে প্রচলিত একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা প্রভু, জায়গিরদার এবং ভূমিদাসের একটি স্তরবিন্যাসযুক্ত কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গঠিত ছিল।

সমতাবাদ (Egalitarianism)

এমন একটি সামাজিক কাঠামো যেখানে কোনো আনুষ্ঠানিক শ্রেণিবিন্যাস বা সামাজিক শ্রেণি থাকে না এবং সিদ্ধান্তগুলো কর্তৃত্বের পরিবর্তে ঐকমত্যের মাধ্যমে নেওয়া হয়।

জীবনধারণভিত্তিক কৃষি (Subsistence Agriculture)

নিজের এবং সম্প্রদায়ের ভরণপোষণের জন্য ফসল উৎপাদন এবং পশু পালনের একটি কৃষি ব্যবস্থা, যেখানে বাণিজ্য প্রধান উদ্দেশ্য নয়।

__________________________________________

Q১. ১০,০০০ বছর আগে কোন বড় পরিবর্তনটি ঘটেছিল?

প্রায় ১০,০০০ বছর আগে মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় বা কৃষি বিপ্লব (Neolithic Revolution) সূচিত হয়েছিল [২], [২৪]।

  • পরিবর্তনের প্রকৃতি: এই সময়ের আগে মানুষ ছিল যাযাবর এবং তারা বন্য পশু শিকার ও ফলমূল সংগ্রহের ওপর নির্ভরশীল ছিল [২]। কৃষি আবিষ্কারের ফলে মানুষ উদ্ভিদ ও প্রাণীকে গৃহপালিত করতে শেখে, যা তাদের এক জায়গায় স্থায়ীভাবে বসবাস বা বসতি স্থাপনের সুযোগ করে দেয় [২]।

  • প্রভাব: কৃষির ফলে মানুষ প্রয়োজনে অতিরিক্ত খাদ্য (surplus food) উৎপাদন করতে সক্ষম হয় [৩]। এই উদ্বৃত্ত খাদ্য সমাজকে জটিল করে তোলে এবং কারিগর ও ব্যবসায়ীর মতো বিশেষায়িত পেশার জন্ম দেয় [৩]।

  • সভ্যতার বিকাশ: এই পরিবর্তনের ফলেই মেসোপটেমিয়া, মিশর এবং চীনের মতো প্রাচীন সভ্যতাগুলোর উত্থান ঘটে [৩]। মধ্যপ্রাচ্যের ফার্টিল ক্রিসেন্ট (Fertile Crescent) অঞ্চলে প্রায় ১০,০০০ বছর আগে গম ও বার্লি চাষের মাধ্যমে এই বিপ্লব শুরু হয়েছিল [২৪]।

Q২. আদি ও আধুনিক সমাজের মধ্যবর্তী রূপান্তর পর্যায়গুলোর মূল বৈশিষ্ট্য কী?

আদি (শিকারি) সমাজ থেকে আধুনিক (শিল্পায়িত) সমাজে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কৃষি এবং শিল্প বিপ্লব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই পর্যায়গুলোর মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:

  • স্থায়ী বসবাস ও উদ্বৃত্ত উৎপাদন: যাযাবর জীবন ছেড়ে মানুষ যখন কৃষিতে প্রবেশ করে, তখন স্থায়ী বসতি এবং খাদ্যের উদ্বৃত্ত তৈরি হয় [২], [৩]। এটি সামাজিক স্তরবিন্যাস এবং লিখন পদ্ধতির বিকাশে সহায়তা করে [৩]।

  • প্রযুক্তিগত অগ্রগতি: ধাতববিদ্যার (metallurgy) ব্যবহার, বিশেষ করে লোহা ও ব্রোঞ্জের ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেয় [৩]। পরবর্তীতে ১৮শ শতাব্দীতে বাষ্পীয় ইঞ্জিনের মতো যন্ত্রের আবিষ্কার উৎপাদন ব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেয় [৩৬]।

  • নগরায়ন (Urbanization): শিল্প বিপ্লবের ফলে মানুষ কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে আসতে শুরু করে, যা আধুনিক নগরায়নের ভিত্তি স্থাপন করে [৪], [৪১]।

  • শ্রম বিভাজন (Division of Labor): আধুনিক শিল্প সমাজে প্রতিটি মানুষ নির্দিষ্ট কাজে দক্ষ হয়ে ওঠে, যা যান্ত্রিকীকরণ এবং কারখানার উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য [৪০], [৪১]।

Q৩. দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য কী ছিল?

শিল্প সমাজের বিকাশের তৃতীয় ধাপ হিসেবে দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব পরিচিত, যা ১৯শ শতাব্দীর শেষভাগে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত স্থায়ী ছিল [৩৭]।

  • মূল উদ্ভাবন: এই পর্যায়টি মূলত বিদ্যুৎ এবং অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনের (internal combustion engine) আবিষ্কার দ্বারা চিহ্নিত [৩৭]।

  • শিল্পের প্রসার: এই উদ্ভাবনগুলো গাড়ি শিল্পের (automobile industry) মতো নতুন নতুন শিল্পের জন্ম দেয় [৩৭]।

  • গণ-উৎপাদন ও ভোগবাদ: এই সময়ে গণ-উৎপাদন (mass production) শুরু হয় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোগ্যপণ্যের ব্যবহার বা ভোক্তা সংস্কৃতির (consumer culture) উত্থান ঘটে [৩৮]।

Q৪. প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক রূপান্তরগুলো কীভাবে মানব সমাজের বৈশিষ্ট্যকে বদলে দিয়েছে?

ইতিহাসজুড়ে প্রধান প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনগুলো মানুষের জীবনধারা ও সামাজিক কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে:

  • সামাজিক কাঠামো: কার্ল মার্ক্সের মতে, অর্থনৈতিক সম্পর্কের পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজ আদিম সাম্যবাদ থেকে দাস সমাজ, সামন্তবাদ এবং পরবর্তীতে ক্যাপিটালিজমে (capitalism) রূপান্তরিত হয়েছে [৬], [৭]।

  • যাযাবর থেকে স্থায়ী জীবন: কৃষি প্রযুক্তি মানুষকে যাযাবর শিকারি জীবন থেকে স্থায়ী কৃষক সমাজে পরিণত করেছে [২]।

  • ব্যুরোক্রেটাইজেশন (Bureaucratization): শিল্পায়নের ফলে কর্পোরেশন এবং সরকারি সংস্থার মতো জটিল প্রশাসনিক কাঠামোর উদ্ভব হয়েছে, যা সমাজ পরিচালনায় নতুন দক্ষতা যোগ করেছে [৪৪]।

  • বিশ্বায়ন (Globalization): বর্তমান তথ্য প্রযুক্তির যুগে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে বিশ্ব একটি সংযুক্ত ও আন্তঃনির্ভরশীল অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে [৩৯]।

Q৫. বিশ্বজুড়ে মানব সমাজের বিবর্তনের স্থান-কালিক বৈচিত্র্য (Spatio-temporal variation) কেমন?

মানবেতিহাসের বিবর্তন পৃথিবীর সব জায়গায় একই সময়ে বা একইভাবে ঘটেনি। এর মধ্যে যথেষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে:

  • শিকারি সমাজ: আফ্রিকা (সান ও হাদজা জনগোষ্ঠী), এশিয়া (সাইবেরিয়ার নেনেটস), এবং দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অঞ্চলে (ইয়ানোমামি) হাজার হাজার বছর ধরে এই জীবনধারা টিকে ছিল এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে এখনো আছে [১০], [১১], [১২]।

  • কৃষি বিপ্লবের সময়কাল: মধ্যপ্রাচ্যে ১০,০০০ বছর আগে কৃষি শুরু হলেও আমেরিকায় আদিবাসীরা ভুট্টা ও মটরশুঁটি চাষ শুরু করে প্রায় ৮,০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে [২৪], [২৫]। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সাব-সাহারা আফ্রিকায় এই রূপান্তর ভিন্ন ভিন্ন সময়ে স্থানীয় পরিবেশ অনুযায়ী ঘটেছে [২৫]।

  • শিল্পায়ন ও নগরায়ন: শিল্প বিপ্লব ১৮শ শতাব্দীতে ব্রিটেনে শুরু হলেও ইউরোপের অন্য দেশ এবং উত্তর আমেরিকায় তা ছড়িয়েছে ১৯শ শতাব্দীতে [৩৬]। বর্তমানে সাব-সাহারা আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ এখনো কৃষিপ্রধান থাকলেও তারা ধীরে ধীরে আধুনিক প্রযুক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে [৩২], [৩৫]।

  • শহরের বিবর্তন: রোম বা বেইজিংয়ের মতো প্রাক-শিল্প শহরগুলো ছিল বাণিজ্যের কেন্দ্র [৪৬], [৪৭]। কিন্তু ম্যানচেস্টার বা পিটসবার্গের মতো শিল্প শহরগুলোর বিকাশ ঘটেছে ১৮শ-১৯শ শতাব্দীতে কারখানার ওপর ভিত্তি করে [৪৮], [৪৯]। বর্তমানে নিউ ইয়র্ক বা টোকিওর মতো গ্লোবাল সিটিগুলো বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে [৫২], [৫৪]।

এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট যে, প্রযুক্তি এবং অর্থনীতির পরিবর্তনই মানব সমাজের বিবর্তনের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।


No comments:

Post a Comment