ভূমিকা
"ভাষাগত জগৎ" বা "সাংস্কৃতিক-ভাষাগত অঞ্চল" বলতে এমন একটি ভৌগোলিক এলাকাকে বোঝায় যেখানে প্রচলিত ভাষাগুলো একটি সাধারণ উৎস বা পরিবার থেকে উদ্ভূত হয়েছে। এই ভাষাগুলো শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং মানব ইতিহাস, অভিবাসন, এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক জীবন্ত দলিল। ভাষা হলো সেই লেন্স, যার মাধ্যমে আমরা অতীতের মানবগোষ্ঠীর গতিপথ, তাদের বিজয়, এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নিদর্শন খুঁজে পাই। এই নথির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের প্রধান প্রধান ভাষাগত পরিবারগুলোর একটি সুসংগঠিত পরিচয় তুলে ধরা। আমরা প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক বিস্তার, প্রধান ভাষাসমূহ এবং তাদের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে আলোচনা করব, যা বিশ্বজুড়ে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বোঝার জন্য একটি মজবুত ভিত্তি প্রদান করবে।
১. ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগত জগৎ
ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগত জগৎ বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত ভাষা পরিবার। বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যা এই পরিবারের কোনো না কোনো ভাষায় কথা বলে। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার হাত ধরে এই ভাষাগুলো বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৈশ্বিক রাজনীতি, বিজ্ঞান ও যোগাযোগের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। ইংরেজি, স্প্যানিশ এবং ফরাসি ভাষার মতো প্রভাবশালী ভাষাগুলো এই পরিবারেরই অংশ, যা এটিকে আধুনিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষাগত শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ভৌগোলিক অবস্থান
এই ভাষা পরিবারটি প্রায় সমগ্র ইউরোপ, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং দক্ষিণ ও পশ্চিম এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রয়েছে। এর প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চলগুলো হলো:
জার্মানিক অঞ্চল: উত্তর-পশ্চিম ইউরোপ (যুক্তরাজ্য, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক, সুইডেন, নরওয়ে) এবং উত্তর আমেরিকা ও ওশেনিয়া (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড)।
রোমান্স অঞ্চল: দক্ষিণ ইউরোপ (ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, পর্তুগাল, রোমানিয়া) এবং লাতিন আমেরিকা (মেক্সিকো, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া)।
স্লাভিক অঞ্চল: পূর্ব ইউরোপ (রাশিয়া, ইউক্রেন, পোল্যান্ড, চেক প্রজাতন্ত্র, সার্বিয়া, বুলগেরিয়া)।
ইন্দো-ইরানীয় অঞ্চল: দক্ষিণ এশিয়া (ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল) এবং পশ্চিম এশিয়া (ইরান, আফগানিস্তান)।
কেল্টিক অঞ্চল: পশ্চিম ইউরোপ (আয়ারল্যান্ড, ওয়েলস, স্কটল্যান্ড)।
হেলেনিক অঞ্চল: দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপ (গ্রিস, সাইপ্রাস)।
বাল্টিক অঞ্চল: পূর্ব ইউরোপ (লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া)।
প্রধান ভাষাসমূহ
ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের বিভিন্ন শাখার প্রধান ভাষাগুলো এবং তাদের আনুমানিক ভাষীর সংখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
এই ভাষা পরিবারের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা এটিকে অন্য পরিবারগুলো থেকে আলাদা করে।
উৎপত্তি ও বিস্তার: এর উৎপত্তি প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় (Proto-Indo-European) ভাষা থেকে, যার উৎসস্থল নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে এর বিশ্বব্যাপী বিস্তার ঘটেছে মূলত ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতার মাধ্যমে, যা ইংরেজি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ ও ফরাসি ভাষাকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছে।
লিখন পদ্ধতি: এই পরিবারে একাধিক লিখন পদ্ধতির ব্যবহার দেখা যায়, যেমন—লাতিন, সিরিলিক এবং দেবনাগরী। এই বৈচিত্র্য বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসের প্রতিফলন ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, লাতিন বর্ণমালা ক্যাথলিক এবং সিরিলিক বর্ণমালা অর্থোডক্স খ্রিস্টান ধর্মের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত।
ভাষাগত কাঠামো: এর ভাষাগুলো মূলত প্রত্যয়-প্রধান (inflectional)। এখানে ক্রিয়াপদের কাল এবং বিশেষ্যের লিঙ্গ ও বচন অনুযায়ী রূপের পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবারের ভাষাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ উৎস থেকে উদ্ভূত শব্দের (cognates) উপস্থিতি দেখা যায়, যেমন—ইংরেজি mother, জার্মান Mutter, লাতিন mater এবং হিন্দি মাতা।
আধুনিক অবস্থা ও ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব: বর্তমানে ইংরেজি বিশ্বের প্রধান সংযোগকারী ভাষা (lingua franca) হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে, যে ভাষাভাষী জাতি অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী হয়েছে, তাদের ভাষার প্রভাবও তত বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারের এই ব্যাপক বিস্তার এবং একাধিক লিখন পদ্ধতির বৈচিত্র্যের বিপরীতে, আমরা এবার এমন একটি ভাষাগত জগতের দিকে নজর দেব যা মূলত একটি একক চিত্রলৈখিক (logographic) লিখন পদ্ধতির মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ।
২. চীন-তিব্বতীয় ভাষাগত জগৎ
চীন-তিব্বতীয় ভাষাগত জগৎ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্থানীয় ভাষাভাষীর ভাষা—ম্যান্ডারিন—এই পরিবারেরই অংশ। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সুর বা টোনের ব্যবহার এবং একটি চিত্রলৈখিক লিখন পদ্ধতি, যা সমগ্র পূর্ব এশিয়ার সংস্কৃতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। হাজার হাজার চিত্রলিপির মাধ্যমে ভাব প্রকাশের এই পদ্ধতি বর্ণমালার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা ইন্দো-ইউরোপীয় জগৎ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভৌগোলিক অবস্থান
এই ভাষাগত জগৎ মূলত পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে বিস্তৃত। এর প্রধান অঞ্চলগুলো হলো:
সাইনিটিক (চীনা) অঞ্চল: চীন, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং বিশ্বজুড়ে চীনা প্রবাসীরা।
তিব্বতীয় অঞ্চল: তিব্বত, নেপাল, ভুটান এবং ভারতের লাদাখ।
বর্মী অঞ্চল: মিয়ানমার এবং থাইল্যান্ডের কিছু অংশ।
তাই-কাদাই অঞ্চল: থাইল্যান্ড, লাওস এবং দক্ষিণ চীনের কিছু অংশ।
প্রধান ভাষাসমূহ
এই পরিবারের প্রধান উপ-পরিবার ও ভাষাগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
চীন-তিব্বতীয় ভাষাগত জগতের কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
লিখন পদ্ধতি: এই পরিবারে চিত্রলৈখিক (logographic) লিখন পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়, যেখানে প্রতিটি চিহ্ন একটি শব্দ বা ধারণাকে প্রকাশ করে, কোনো ধ্বনিকে নয়। এই চীনা অক্ষর বা "হানজি" ব্যবস্থা জাপান, কোরিয়া এবং ভিয়েতনামের লিখন পদ্ধতির ওপর ঐতিহাসিক প্রভাব ফেলেছে। আধুনিক চীনে সরলীকৃত অক্ষর ব্যবহৃত হলেও তাইওয়ান ও হংকংয়ে ঐতিহ্যবাহী অক্ষর প্রচলিত, যা রাজনৈতিক বিভাজনেরও প্রতীক।
টোনাল সিস্টেম: এটি এই ভাষা পরিবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এখানে শব্দের সুর বা টোন পরিবর্তন হলে তার অর্থও বদলে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ম্যান্ডারিন ভাষায় চারটি প্রধান টোন রয়েছে, যা একই উচ্চারণের শব্দকে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ প্রদান করে।
ব্যাকরণ ও কাঠামো: এর ব্যাকরণে প্রত্যয়ের ব্যবহার খুবই কম। ক্রিয়াপদের কোনো কাল বা বচনভিত্তিক পরিবর্তন হয় না এবং বিশেষ্যেরও কোনো লিঙ্গ নেই। বাক্যের অর্থ মূলত শব্দের ক্রম এবং সহায়ক কণার (particles) ওপর নির্ভর করে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব: ঐতিহাসিকভাবে, চীনা অক্ষর ব্যবস্থা জাপান, কোরিয়া এবং ভিয়েতনামের সংস্কৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। বর্তমানে চীন সরকার কনফুসিয়াস ইনস্টিটিউটের মতো উদ্যোগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ম্যান্ডারিন ভাষার প্রচার চালাচ্ছে। এর পাশাপাশি, দেশের অভ্যন্তরে ম্যান্ডারিনকে (পুতোংহুয়া) জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সময় তিব্বতী ও উইঘুরের মতো সংখ্যালঘু ভাষাগুলোকে একীভূত করার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়, যা একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
পূর্ব এশিয়ার এই চিত্রলিপি-ভিত্তিক এবং টোনাল সিস্টেম থেকে সরে গিয়ে, এবার আমরা মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার আফ্রো-এশিয়াটিক জগতের দিকে যাব, যা তার মূল-ভিত্তিক এবং ব্যঞ্জনধ্বনি-প্রধান কাঠামোর জন্য পরিচিত।
৩. আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষাগত জগৎ
আফ্রো-এশিয়াটিক ভাষাগত জগৎ বিশ্বের প্রধান দুটি ধর্ম—ইসলাম ও ইহুদি ধর্মের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে জড়িত। এই ভাষা পরিবারের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর ত্রিব্যঞ্জনধ্বনি-ভিত্তিক শব্দমূল ব্যবস্থা, যা শব্দের অর্থ গঠনের ক্ষেত্রে অন্য সব ভাষা পরিবার থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পদ্ধতি অনুসরণ করে। আরবি এবং হিব্রুর মতো ভাষাগুলোর পবিত্র মর্যাদা এবং তাদের লিখন পদ্ধতি এই অঞ্চলকে একটি বিশেষ ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় দিয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান
এই ভাষাগত জগৎটি মূলত উত্তর আফ্রিকা, আরব উপদ্বীপ এবং আফ্রিকার শৃঙ্গ (Horn of Africa) অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। এর প্রধান অঞ্চলগুলো হলো:
সেমিটিক অঞ্চল: উত্তর আফ্রিকা (মিশর, লিবিয়া, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, মরক্কো), আরব উপদ্বীপ, এবং লেভান্ট (সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান)। হিব্রু ভাষার জন্য ইসরায়েল।
বারবার অঞ্চল: উত্তর আফ্রিকা (মরক্কো, আলজেরিয়া)।
কুশিটিক অঞ্চল: আফ্রিকার শৃঙ্গ (ইথিওপিয়া, সোমালিয়া)।
চ্যাডিক অঞ্চল: পশ্চিম আফ্রিকা (নাইজেরিয়া, নাইজার)।
প্রধান ভাষাসমূহ
এই ভাষা পরিবারের প্রধান ভাষাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
আফ্রো-এশিয়াটিক জগৎকে সংজ্ঞায়িত করে এমন কিছু মূল বৈশিষ্ট্য নিচে আলোচনা করা হলো:
মূল-ভিত্তিক শব্দ গঠন: এই পরিবারের সেমিটিক ভাষাগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তিন-ব্যঞ্জনধ্বনি-ভিত্তিক শব্দমূল (3-consonant root system)। একটি মূল থেকে বিভিন্ন স্বরবর্ণ যোগ করে নতুন নতুন শব্দ তৈরি করা হয়। যেমন, আরবিতে ك-ت-ب (k-t-b) মূলটি "লেখা" ধারণার সঙ্গে যুক্ত। এই মূল থেকে كتاب (kitāb - বই) এবং كاتب (kātib - লেখক) শব্দগুলো গঠিত হয়।
লিখন পদ্ধতি: এই অঞ্চলের প্রধান লিখন পদ্ধতি হলো আরবি আবজাদ, যা ডান থেকে বামে লেখা হয় এবং যেখানে স্বরবর্ণের ব্যবহার বাধ্যতামূলক নয়। এছাড়া হিব্রু এবং ইথিওপিয়ার গে'এজ লিপিও এই পরিবারে ব্যবহৃত হয়।
ডিগ্লোসিয়া (Diglossia): আরব বিশ্বে এটি একটি অনন্য ভাষাগত পরিস্থিতি, যেখানে দুটি ভিন্ন ভাষারূপ সহাবস্থান করে—একটি হলো আনুষ্ঠানিক বা লিখিত আধুনিক প্রমিত আরবি (Modern Standard Arabic), এবং অন্যটি হলো দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত বিভিন্ন আঞ্চলিক কথ্য উপভাষা। এই বিভাজন শিক্ষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাব ফেলে।
ধর্মীয় সংযোগ: ধ্রুপদী আরবি ভাষা ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ কুরআনের ভাষা এবং হিব্রু ইহুদি ধর্মের মূল ভাষা হওয়ায় এই দুটি ভাষার একটি পবিত্র মর্যাদা রয়েছে। এই ধর্মীয় সংযোগ ভাষাগুলোকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকিয়ে রেখেছে এবং তাদের সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
আরব বিশ্বের এই তুলনামূলকভাবে ঐক্যবদ্ধ (ডিগ্লোসিয়া সত্ত্বেও) ভাষাগত জগৎ থেকে আমরা এখন সাহারা-নিম্ন আফ্রিকার নাইজার-কঙ্গো পরিবারের দিকে যাব, যা তার চরম ভাষাগত বৈচিত্র্যের জন্য পরিচিত।
৪. নাইজার-কঙ্গো ভাষাগত জগৎ
নাইজার-কঙ্গো ভাষাগত জগৎকে বিশ্বের সবচেয়ে ভাষাগতভাবে বৈচিত্র্যময় অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেখানে প্রায় ১,৫০০টিরও বেশি ভাষা প্রচলিত। এই অঞ্চলের ভাষাগুলোর অধ্যয়ন প্রাক-ঔপনিবেশিক আফ্রিকার জটিল সমাজব্যবস্থা এবং ঔপনিবেশিক ভাষা নীতির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। এই জগৎটি ভাষার জন্ম, বিকাশ এবং বিপন্নতার এক জীবন্ত পরীক্ষাগার।
ভৌগোলিক অবস্থান
এই বিশাল ভাষাগত অঞ্চলটি সাহারা-নিম্ন আফ্রিকার প্রায় সমগ্র অংশ জুড়ে বিস্তৃত, যা পশ্চিম আফ্রিকার সেনেগাল থেকে শুরু করে পূর্ব আফ্রিকার কেনিয়া এবং দক্ষিণে দক্ষিণ আফ্রিকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এর প্রধান অঞ্চলগুলোর মধ্যে রয়েছে বান্টু, পশ্চিম আফ্রিকান, পূর্ব আফ্রিকান এবং মধ্য আফ্রিকান অঞ্চল।
প্রধান ভাষাসমূহ
এই অঞ্চলে ভাষার সংখ্যা এত বেশি যে তাদের সারণিতে উপস্থাপন করা কঠিন। তবে কিছু প্রধান এবং বহুল প্রচলিত ভাষা হলো:
সোয়াহিলি: পূর্ব আফ্রিকার প্রধান সংযোগকারী ভাষা (lingua franca)। ভাষীর সংখ্যা প্রায় ১৫০ মিলিয়ন।
ইয়োরুবা: নাইজেরিয়া এবং পশ্চিম আফ্রিকার একটি প্রধান ভাষা। ভাষীর সংখ্যা প্রায় ৪৫ মিলিয়ন।
ইগবো: দক্ষিণ-পূর্ব নাইজেরিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা। ভাষীর সংখ্যা প্রায় ২৭ মিলিয়ন।
জুলু ও খোসা: দক্ষিণ আফ্রিকার দুটি প্রধান ভাষা, যারা তাদের অনন্য "ক্লিক" ধ্বনির জন্য পরিচিত।
হাউসা: পশ্চিম আফ্রিকার আরেকটি প্রধান সংযোগকারী ভাষা (যদিও এটি প্রযুক্তিগতভাবে আফ্রো-এশিয়াটিক পরিবারের চ্যাডিক শাখার অন্তর্গত, ভৌগোলিকভাবে এটি এই অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত)।
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
এই ভাষাগত জগতের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
ভাষাগত বৈচিত্র্য ও বিপদাপন্নতা: এই অঞ্চলে ১,৫০০টিরও বেশি ভাষার উপস্থিতি একে বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় ভাষাগত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত করেছে। তবে ঔপনিবেশিক ভাষাগুলোর (ইংরেজি, ফরাসি, পর্তুগিজ) প্রভাবে এবং বিশ্বায়নের কারণে এখানকার অনেক ভাষাই আজ বিপন্ন।
বিশেষ্য শ্রেণী (Noun Classes): বান্টু ভাষাগুলোর একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিশেষ্য শ্রেণী ব্যবস্থা। এখানে বিশেষ্য পদগুলোকে তাদের বৈশিষ্ট্য (যেমন—প্রাণী, বস্তু, আকার) অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা হয় এবং বাক্যের অন্যান্য পদকেও সেই অনুযায়ী পরিবর্তন করতে হয়।
ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: এই অঞ্চলের অনেক ভাষায় সুর বা টোনের ব্যবহার রয়েছে, যা শব্দের অর্থ নির্ধারণ করে (চীন-তিব্বতীয় পরিবারের মতো)। এছাড়াও, জুলু এবং খোসা ভাষায় অনন্য "ক্লিক" ব্যঞ্জনধ্বনির ব্যবহার দেখা যায়, যা পার্শ্ববর্তী খোইসান ভাষা থেকে গৃহীত।
ঔপনিবেশিক প্রভাব: ইংরেজি, ফরাসি এবং পর্তুগিজের মতো ইউরোপীয় ভাষাগুলো অনেক দেশের সরকারি ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই ভাষাগুলো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করলেও, তা স্থানীয় ভাষাগুলোর বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। শহরাঞ্চলে প্রায়ই স্থানীয় ভাষার সঙ্গে ইউরোপীয় ভাষার মিশ্রণ বা "কোড-সুইচিং" লক্ষ্য করা যায়।
আফ্রিকার এই মহাদেশ-ভিত্তিক চরম বৈচিত্র্যময় ভাষাগত জগৎ থেকে এবার আমরা এমন একটি ভাষা পরিবারের দিকে যাব, যা সমুদ্রপথে ছড়িয়ে পড়েছে এবং আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা পর্যন্ত তার বিস্তার ঘটিয়েছে।
৫. অস্ট্রোনেশীয় ভাষাগত জগৎ
অস্ট্রোনেশীয় ভাষাগত জগৎ মানুষের সামুদ্রিক অভিযানের এক অসাধারণ নিদর্শন। এটি ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত ভাষা পরিবার, যা পূর্ব আফ্রিকার মাদাগাস্কার থেকে শুরু করে দক্ষিণ আমেরিকার ইস্টার আইল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত। হাজার হাজার মাইল সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে ছড়িয়ে পড়া এই ভাষাগুলো একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রমাণ বহন করে, যা তাদের ভাষাগত মিলের মধ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
ভৌগোলিক অবস্থান
এই ভাষা পরিবারটি এক বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে আছে:
সামুদ্রিক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ: পলিনেশিয়া, মাইক্রোনেশিয়া (যেমন—হাওয়াই, সামোয়া, ফিজি)।
তাইওয়ান: এই ভাষা পরিবারের উৎসস্থল বলে মনে করা হয়।
মাদাগাস্কার: ভারত মহাসাগরের এই দ্বীপটি এই পরিবারের পশ্চিমতম সীমা।
প্রধান ভাষাসমূহ
অস্ট্রোনেশীয় পরিবারের প্রধান ভাষাগুলো নিচে সারণিতে দেখানো হলো:
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
এই সমুদ্রচারী ভাষা পরিবারের কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে:
সামুদ্রিক বিস্তার: প্রায় ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তাইওয়ান থেকে শুরু হওয়া এই পরিবারের সামুদ্রিক বিস্তার ছিল এক অবিশ্বাস্য অভিযান। প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ভাষাগুলোতে নৌকা, সমুদ্র এবং নক্ষত্র সম্পর্কিত সাধারণ শব্দভান্ডার তাদের এই অভিন্ন যাত্রার সাক্ষ্য দেয়। উদাহরণস্বরূপ, "মাতা" (mata) শব্দটি মালয়, তাগালগ এবং হাওয়াইয়ান ভাষায় "চোখ" বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
ভাষা প্রমিতকরণ (Standardization): ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপাইনের মতো বহুভাষাভাষী দ্বীপপুঞ্জ দেশগুলোতে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য বাহাসা ইন্দোনেশিয়া এবং ফিলিপিনো ভাষাকে সচেতনভাবে প্রমিত করা হয়েছে। এই ভাষাগুলো মূলত বাণিজ্যিক ভাষা থেকে জাতীয় ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে।
ভাষা বিপদাপন্নতা ও পুনরুজ্জীবন: একদিকে যেমন ইন্দোনেশীয় ও ফিলিপিনোর মতো প্রমিত ভাষাগুলো সফল, তেমনই হাওয়াইয়ান এবং মাওরির মতো অনেক ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে ছিল। তবে সম্প্রতি এই ভাষাগুলোকে पुनরুজ্জীবিত করার আন্দোলন বিশ্বজুড়ে আদিবাসী ভাষা রক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
লিখন পদ্ধতির ইতিহাস: ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে এই অঞ্চলের ভাষাগুলো তাদের প্রাক-ঔপনিবেশিক লিপি (যেমন—ফিলিপাইনের বায়বায়িন) বা আরবি লিপি (জাউই) থেকে সরে এসে বর্তমানে মূলত লাতিন বর্ণমালা ব্যবহার করে।
তাইওয়ান থেকে উদ্ভূত হয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই অস্ট্রোনেশীয় ভাষা পরিবার থেকে আমরা এবার এমন একটি প্রাচীন ভাষা পরিবারের দিকে যাব, যা বর্তমানে মূলত দক্ষিণ ভারতে কেন্দ্রীভূত।
৬. দ্রাবিড় ভাষাগত জগৎ
দ্রাবিড় ভাষাগত জগৎ ভারতের এক স্বতন্ত্র ও প্রাচীন ভাষাগত পরিচয় বহন করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ভাষা পরিবারটি উত্তর ভারতের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাক-আর্য সভ্যতার এক জীবন্ত ভাষাগত প্রমাণ, যার একটি নিজস্ব ও সমৃদ্ধ সাহিত্যিক ঐতিহ্য রয়েছে যা হাজার হাজার বছরের পুরনো।
ভৌগোলিক অবস্থান
এই ভাষা পরিবারটি প্রধানত দক্ষিণ ভারতে কেন্দ্রীভূত। এর মূল অঞ্চলগুলো হলো তামিলনাড়ু, কেরালা, কর্ণাটক এবং অন্ধ্রপ্রদেশ। তবে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে প্রচলিত ব্রাহুই ভাষা এই পরিবারের একটি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন নিদর্শন, যা এর প্রাচীন বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
প্রধান ভাষাসমূহ
দ্রাবিড় পরিবারের চারটি প্রধান ভাষা এবং তাদের ভাষীর সংখ্যা নিচে দেওয়া হলো:
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
যে বৈশিষ্ট্যগুলো এই ভাষাগত জগৎকে অনন্য করে তুলেছে, সেগুলো হলো:
প্রাচীন ও স্বাধীন ঐতিহ্য: এই ভাষা পরিবারটি ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবার থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিশেষ করে, তামিল ভাষাকে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যার সঙ্গম সাহিত্য দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো।
ভাষাগত প্রতিরোধ: দ্রাবিড় ভাষাগুলোর একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক মাত্রা রয়েছে। দক্ষিণ ভারতে, বিশেষ করে তামিলনাড়ুতে, হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ দেখা যায়। এই প্রতিরোধকে আঞ্চলিক ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষার একটি সংগ্রাম হিসেবে দেখা হয়।
ব্রাহুই ভাষার রহস্য: পাকিস্তানে প্রচলিত ব্রাহুই ভাষা ভাষাবিদদের জন্য একটি বড় রহস্য। দক্ষিণ ভারত থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে এর উপস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, ইন্দো-আর্যদের আগমনের পূর্বে দ্রাবিড় ভাষাগুলো হয়তো সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে বিস্তৃত ছিল।
লিখন পদ্ধতি: দ্রাবিড় ভাষাগুলোর নিজস্ব লিপি রয়েছে (যেমন—তামিল, তেলুগু, কন্নড় লিপি), যা উত্তর ভারতে হিন্দির জন্য ব্যবহৃত দেবনাগরী লিপি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দক্ষিণ ভারতের এই প্রাচীন, কেন্দ্রীভূত এবং সাহিত্য-নির্ভর দ্রাবিড় জগৎ থেকে আমরা এবার এমন এক ভাষা পরিবারের দিকে যাব, যার ঐতিহ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন—মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চলের যাযাবর সংস্কৃতি থেকে উদ্ভূত এবং জোড়কলম-ভিত্তিক আলতাইয় ভাষাসমূহ।
৭. আলতাইয় (তুর্কি) ভাষাগত জগৎ
আলতাইয় (মূলত তুর্কি) ভাষাগত জগৎ এমন একটি পরিবার যা তার যাযাবর ঐতিহ্য এবং জোড়কলম (agglutination) নামক ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের দ্বারা আবদ্ধ। বিংশ শতাব্দীর নাটকীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, বিশেষ করে লিপি সংস্কার এবং সোভিয়েত-পরবর্তী ভাষা পুনরুজ্জীবন, এই পরিবারের আধুনিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এটি এমন একটি ভাষাগত জগৎ যা পরিচয়, রাজনীতি এবং ইতিহাসের এক জটিল মিশ্রণ।
ভৌগোলিক অবস্থান
এই ভাষা পরিবারটি আনাতোলিয়া (তুরস্ক) থেকে শুরু করে ককেশাস (আজারবাইজান), মধ্য এশিয়া (কাজাখস্তান, উজবেকিস্তান) হয়ে চীনের জিনজিয়াং (উইঘুর) পর্যন্ত বিস্তৃত।
প্রধান ভাষাসমূহ
প্রধান তুর্কি ভাষাগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
এই ভাষাগত জগতের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
ভাষাগত কাঠামো (Agglutination): এই পরিবারের ভাষাগুলোর প্রধান ব্যাকরণগত বৈশিষ্ট্য হলো জোড়কলম পদ্ধতি। এখানে একটি মূল শব্দের সঙ্গে একাধিক প্রত্যয় যুক্ত করে জটিল অর্থ প্রকাশ করা হয়, যা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার মতো বিভক্তি-প্রধান কাঠামো থেকে ভিন্ন।
লিপি বিতর্ক: লিপি পরিবর্তন এই অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিবৃতির প্রতীক। যেমন, ১৯২৮ সালে কামাল আতাতুর্কের অধীনে তুরস্কে আরবি লিপি থেকে লাতিন লিপিতে উত্তরণ একটি আধুনিকীকরণের পদক্ষেপ ছিল। অন্যদিকে, মধ্য এশিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সিরিলিক থেকে লাতিন লিপিতে ফেরার চেষ্টা এবং চীনের উইঘুরদের আরবি লিপি রক্ষার সংগ্রাম তাদের পরিচয়ের লড়াইয়ের অংশ।
ভাষাগত জাতীয়তাবাদ: আধুনিক জাতি-রাষ্ট্র গঠনে ভাষা এখানে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। সোভিয়েত-পরবর্তী সময়ে জাতীয় ভাষার পুনরুজ্জীবন, প্যান-তুর্কিবাদের ধারণা এবং চীনে উইঘুর ভাষার ওপর দমন-পীড়ন—এই সবই প্রমাণ করে যে ভাষা এখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে কতটা ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চলের তুর্কি ভাষাগুলো থেকে আমরা এবার ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অস্ট্রো-এশিয়াটিক পরিবারের দিকে যাব, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ভারতে ছড়িয়ে আছে।
৮. অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগত জগৎ
অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগত জগৎ একটি ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন পরিবার, যার একটি প্রধান অংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া) এবং অন্য একটি প্রাচীন ও বিচ্ছিন্ন অংশ মধ্য ভারতে (মুন্ডা ভাষা) অবস্থিত। এই পরিবারের অধ্যয়ন এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দাদের সম্পর্কে গভীর ঐতিহাসিক তথ্য প্রকাশ করে, যারা অন্য ভাষাগোষ্ঠীর আগমনের আগে এখানে বসবাস করত।
ভৌগোলিক অবস্থান
এর দুটি প্রধান ভৌগোলিক অঞ্চল একে অপরের থেকে বহু দূরে অবস্থিত:
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া: ভিয়েতনাম এবং কম্বোডিয়া।
মধ্য ভারত: মুন্ডা ভাষাভাষী উপজাতি অঞ্চল।
প্রধান ভাষাসমূহ
এই পরিবারের প্রধান ভাষাগুলো হলো:
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য
এই ভাষা পরিবারের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিচে উল্লেখ করা হলো:
ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা: ভারতে প্রচলিত মুন্ডা ভাষাগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের আত্মীয় ভাষাগুলো থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাগৈতিহাসিক কালে এই ভাষাভাষী মানুষেরা হয়তো সমগ্র মহাদেশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল।
ভিয়েতনামী ভাষার লিপি বিপ্লব: ভিয়েতনামী ভাষার ইতিহাস অনন্য। এটি প্রথমে চীনা অক্ষরের মতো চিত্রভিত্তিক লিপি ব্যবহার করত, কিন্তু ফরাসি ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে পুরোপুরি রোমান বর্ণমালায় (Quốc Ngữ) রূপান্তরিত হয়। এই পরিবর্তন ভিয়েতনামের উচ্চ সাক্ষরতার হারের পেছনে একটি বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
ভাষাগত বৈশিষ্ট্য: এই পরিবারের ভাষাগুলো মূলত সুর-প্রধান (tonal) এবং একদলীয় (monosyllabic)। দীর্ঘ সময় ধরে চীন-তিব্বতীয় ভাষাভাষীদের সংস্পর্শে থাকার কারণে ভাষাগত অভিসরণের (areal convergence) ফলে এমনটা হয়েছে, যদিও তাদের মধ্যে কোনো বংশগত সম্পর্ক নেই।
এই বিক্ষিপ্ত পরিবার থেকে আমরা এবার দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বংশগতভাবে বিচ্ছিন্ন ভাষার দিকে যাব: জাপানি এবং কোরিয়ান।
৯. জাপানি ও কোরিয়ান বিচ্ছিন্ন ভাষাগত জগৎ
জাপানি এবং কোরিয়ান ভাষা দুটিকে "ভাষাগত বিচ্ছিন্ন" (linguistic isolates) হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ অন্য কোনো প্রধান ভাষা পরিবারের সঙ্গে তাদের কোনো প্রমাণিত বংশগত সম্পর্ক নেই। তাদের অনন্য ব্যাকরণগত কাঠামো এবং লিখন পদ্ধতি তাদের স্বতন্ত্র ইতিহাসের ফসল এবং বর্তমানে এগুলো তাদের শক্তিশালী জাতীয় পরিচয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান
জাপানি: জাপান
কোরিয়ান: কোরীয় উপদ্বীপ (উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া)
প্রধান ভাষাসমূহ
এই দুটি ভাষার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে দেওয়া হলো:
তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য: একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ
জাপানি এবং কোরিয়ান ভাষার কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা তুলনার মাধ্যমে ভালোভাবে বোঝা যায়:
লিখন পদ্ধতি: জাপানি ভাষায় তিনটি ভিন্ন লিপির এক জটিল ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়—কাঞ্জি (চীনা চিত্রলিপি), হিরাগানা এবং কাতাকানা (দুটিই ধ্বনিভিত্তিক বর্ণমালা)। অন্যদিকে, কোরিয়ান ভাষায় রয়েছে হাঙ্গুল—একটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও ধ্বনিগতভাবে স্বচ্ছ বর্ণমালা, যা পঞ্চদশ শতকে বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল।
ব্যাকরণগত কাঠামো: দুটি ভাষার ব্যাকরণে অনেক মিল রয়েছে। উভয়ই কর্তা-কর্ম-ক্রিয়া (Subject-Object-Verb) বাক্য গঠন অনুসরণ করে এবং উভয়ই জোড়কলম-প্রবণ (agglutinative)।
সম্মানসূচক ভাষা (Honorifics): দুটি ভাষাতেই সামাজিক সম্পর্ক প্রকাশের জন্য জটিল সম্মানসূচক ব্যবস্থা রয়েছে। জাপানি ভাষায় কেইগো (Keigo) এবং কোরিয়ান ভাষায় জোনদেনমাল (Jondaenmal) বক্তা এবং শ্রোতার মধ্যকার সামাজিক অবস্থানকে ব্যাকরণের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব: সম্প্রতি দুটি ভাষারই বৈশ্বিক প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে। অ্যানিমে এবং মাঙ্গার জনপ্রিয়তার কারণে জাপানি ভাষার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, কে-পপ এবং কোরিয়ান ড্রামার (হাল্লিউ ওয়েভ) বিশ্বব্যাপী সাফল্যের ফলে কোরিয়ান ভাষা শেখার আগ্রহ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। এছাড়াও, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে তাদের ভাষার মধ্যে ধীরে ধীরে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
একক ভাষাগুলোর এই আলোচনা শেষে, আমরা এখন বিশ্বের প্রধান ভাষাগত জগৎগুলোর একটি সারসংক্ষেপ দেখব।
--------------------------------------------------------------------------------
১০. সারসংক্ষেপ: বিশ্বের প্রধান ভাষাগত জগৎসমূহ
এই আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, বিশ্বের ভাষাগত মানচিত্রটি অভিবাসন, বিজয়, ধর্ম এবং উদ্ভাবনের সুতোয় বোনা এক সমৃদ্ধ নকশা। প্রতিটি ভাষা পরিবার মানব ইতিহাসের এক একটি অধ্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ঔপনিবেশিক বিস্তার থেকে শুরু করে অস্ট্রোনেশীয়দের সামুদ্রিক অভিযান, কিংবা কোরিয়ান ভাষার আধুনিক সাংস্কৃতিক উত্থান—প্রতিটি গল্পই আমাদের বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে গভীরভাবে বুঝতে সাহায্য করে। এই ভাষাগত জগৎগুলো বোঝা কেবল ভাষাবিজ্ঞানের বিষয় নয়, বরং মানব সভ্যতার গতিপথকে জানার একটি অপরিহার্য উপায়।
No comments:
Post a Comment